৭০ অনুচ্ছেদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: হাইকোর্টে রিট খারিজ

দলের বিপক্ষে ভোট দিলে এমপির আসন শূন্য হওয়ার বিধান নিয়ে চ্যালেঞ্জ নাকচ; রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও থাকল না আইনি বাধা

by ABDUR RAHMAN
৭০ অনুচ্ছেদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

জাতীয় সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার বিধানসংবলিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল চ্যালেঞ্জ করে করা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বিজ্ঞাপন
banner

মঙ্গলবার বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ রিটটি করেন এবং নিজেই এর পক্ষে শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরী ও আখতার হোসেন মো. আব্দুল ওয়াহাব।

রিট আবেদনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

রিটকারীর আবেদনে ৭০ অনুচ্ছেদ কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না—এ মর্মে রুল জারির আবেদন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলের কার্যক্রম স্থগিত রাখারও আবেদন করা হয়।

তবে শুনানি শেষে আদালত রিট আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে। তবে এ কারণে তিনি পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না।

এই বিধান নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক রয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালে আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ একই অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছিলেন।

ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিভক্ত আদেশ দেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে রুল জারি করলেও অপর বিচারপতি রিটটি খারিজ করেন। পরে বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে গেলে নিষ্পত্তির জন্য তৃতীয় একটি বেঞ্চে পাঠানো হয়। শুনানি শেষে সেই বেঞ্চও রিট খারিজ করে আদেশ দেন।

রিট খারিজের পর আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান না। তাঁর দাবি, এতে সংসদ সদস্যদের গণতান্ত্রিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিষয়টি সংবিধান ও গণতন্ত্রের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি আরও বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিধান থাকায় সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ বা ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাঁর দাবি, বর্তমানে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, রিট খারিজের আদেশকে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

তিনি বলেন, হাইকোর্ট সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা এবং নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলের বৈধতা ও কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে করা রিট সরাসরি খারিজ করেছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলায় দায়িত্বশীল ও পেশাদার ভূমিকার জন্য ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান তিনি।

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য গত ৬ আগস্ট তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার জন্য দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা, ১৯৯১ কার্যকর রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও এ-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা প্রকাশিত আছে।

হাইকোর্ট রিটটি খারিজ করে দেওয়ায় আদালতের দেওয়া এই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানে রিটের কারণে আর কোনো আইনি স্থগিতাদেশ থাকল না।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলেও এর কারণে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত ও ভোট দেওয়ার সুযোগ কতটা সীমিত হচ্ছে—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংস্কার প্রস্তাবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিএনপির রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারসংক্রান্ত প্রস্তাবেও ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে বর্তমান রিটে হাইকোর্টের খারিজের আদেশের ফলে ৭০ অনুচ্ছেদের বর্তমান সাংবিধানিক অবস্থান বহাল রয়েছে এবং ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই রিটের কারণে কোনো বাধা থাকল না।

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ