গাজার ৯৭% কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত, চাষের নাগালে মাত্র ৩%

FAO-UNOSAT মূল্যায়ন: এক বছরে চাষযোগ্য জমি কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি, সংকটে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকদের জীবিকা

by ABDUR RAHMAN
গাজার ৯৭% কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনে গাজা উপত্যকার কৃষি খাত ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং জাতিসংঘ স্যাটেলাইট সেন্টার (UNOSAT)-এর যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৭ শতাংশ কৃষিজমি এখন ক্ষতিগ্রস্ত বা কৃষকদের ব্যবহারের বাইরে রয়েছে। ফলে বর্তমানে মাত্র ৩ শতাংশ কৃষিজমি চাষাবাদের উপযোগী কিংবা কৃষকদের নাগালের মধ্যে আছে।

বিজ্ঞাপন
banner

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরের তুলনায় গাজায় চাষযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ২৫ শতাংশেরও বেশি কমেছে। ২৪ জুন পর্যন্ত করা মূল্যায়নে দেখা যায়, বর্তমানে মাত্র ৪৪৮ হেক্টর কৃষিজমি অক্ষত ও ব্যবহারযোগ্য রয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে এই পরিমাণ ছিল ৬০১ হেক্টর।

কৃষিজমির পাশাপাশি গাজার গ্রিনহাউসভিত্তিক কৃষিও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ফসল উৎপাদনের এলাকাগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ ধ্বংস হয়েছে। বিশেষ করে দেইর আল-বালাহ এলাকায় গ্রিনহাউস কৃষিতে সবচেয়ে বেশি পতন রেকর্ড করা হয়েছে।

‘ইয়েলো লাইন’ নিয়ে উদ্বেগ

FAO জানিয়েছে, তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ সম্প্রসারিত হওয়ায় বহু কৃষক নিজেদের জমিতে প্রবেশের সুযোগ হারাচ্ছেন। জাতিসংঘের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই রেখার কারণে গাজার প্রায় ৫৫ শতাংশ এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং ওই অঞ্চলে সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

FAO-এর জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক কার্যালয়ের পরিচালক রেইন পলসেন বলেন, সর্বশেষ তথ্য গাজার কৃষি খাতের ক্রমাগত অবনতির চিত্র তুলে ধরছে। কৃষকদের জমিতে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হওয়ায় যেসব এলাকায় কৃষি সম্পদ এখনো অক্ষত রয়েছে, সেখানেও খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সংস্থাটি জানায়, কৃষি উৎপাদন সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সার, সেচ সরঞ্জাম, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের তীব্র সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে এসব সামগ্রী গাজায় প্রবেশ ও বিতরণের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ থাকায় কৃষি খাতের পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুধু ফসল উৎপাদন নয়, পশুপালন খাতও সংকটে রয়েছে। পশুখাদ্য, পশুচিকিৎসা সামগ্রী এবং প্রাণীর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজারে কিছু কৃষি উপকরণ পাওয়া গেলেও সেগুলোর মান নিম্ন এবং দাম সাধারণ কৃষক পরিবারের নাগালের বাইরে বলে জানিয়েছে FAO।

কৃষি পুনরুদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

গাজার কৃষি উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করতে জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে FAO। সংস্থাটির সুপারিশের মধ্যে রয়েছে কৃষকদের নিরাপদে নিজ নিজ জমিতে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা, জরুরি কৃষি উপকরণ গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি পুনর্বাসন করা।

ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে কৃষিজমির পাশাপাশি গ্রিনহাউস, পানির কূপ ও সেচব্যবস্থারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর জীবিকাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২৪ ঘণ্টায় নিহত আরও ১০

এদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় আরও ১০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত তথ্যে মন্ত্রণালয় জানায়, নিহতদের মরদেহ ও আহতদের গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে আহতদের শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত জানানো হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন এবং উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবাকর্মীরা তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না বলেও জানানো হয়েছে।

সর্বশেষ হতাহতের পর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বেড়ে ৭৩ হাজার ৪১৭ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৬০ জন।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২৮৩ জন নিহত এবং ৪ হাজার ২৪৮ জন আহত হয়েছেন।

পুনর্গঠনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন

দীর্ঘ সামরিক অভিযানে গাজার বেসামরিক অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। কৃষি খাতের বিপর্যয়, অবকাঠামো ধ্বংস এবং খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় গাজার মানুষের জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ