অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার দীর্ঘ সময় পরও গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন ও গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের এক নতুন ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, পূর্ব জেরুজালেম এবং ইসরায়েল বিষয়ক এই কমিশন জানিয়েছে, গাজাকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য নিয়েই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও বাহিনী এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও স্নাইপারের গুলিতে অন্তত ১ হাজার ৪৩১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জনই শিশু। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতিকে ‘মোটামুটি কার্যকর’ বলে দাবি করা হলেও জাতিসংঘের কমিশন সেই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতির আড়ালে গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভারী অস্ত্রশস্ত্র, ড্রোন, কোয়াডকপ্টার ও কামান ব্যবহার করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেল আবিব। এছাড়া যুদ্ধবিরতির অস্থায়ী সীমারেখা হিসেবে পরিচিত ‘ইয়েলো লাইন’ দিন দিন গাজার আরও ভেতরে ঢুকে পড়ছে, যা ভূখণ্ডটিতে ইসরায়েলের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও দখলদারিত্ব পাকাপোক্ত করার চক্রান্ত।
গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলায় ২৫৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যেখানে এর আগের দীর্ঘ দেড় দশকে (২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত) এই সংখ্যা ছিল মাত্র ছয়জন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চালানো সামরিক অভিযানে পশ্চিম তীরে নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত কেবল এই অঞ্চল থেকেই ৩৪ হাজার ১৭৬ জন ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে, যা ১৯৬৭ সালের পর ওই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় গণ-বাস্তুচ্যুতির ঘটনা। কমিশনের চেয়ারম্যান ও ভারতীয় আইনজীবী শ্রীনিবাসন মুরালিধর মন্তব্য করেছেন যে, পশ্চিম তীরে বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃত হত্যা, বাড়িঘর ধ্বংস এবং ফিলিস্তিনিদের বসবাসের অযোগ্য করে তোলার এই কৌশল তাদের নির্মূল করার বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে কেবল ইসরায়েলই নয়, বরং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) ভূমিকারও সমালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের ফলে ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি ঘটেছে। পাশাপাশি, নিজেদের কর্মকাণ্ডের সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের নানাভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
এদিকে জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনকে একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। জেনেভায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি মিশন ও রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল মেরন এই প্রতিবেদনকে ‘ভুল তথ্য প্রচারের প্রচারণা’ এবং ইসরায়েলকে হেয় প্রতিপন্ন করার হীন প্রচেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের দাবি, জাতিসংঘের এই কমিশন ইসরায়েলের আত্মরক্ষা ও অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করতে চাইছে।

