‘ট্রান্সজেন্ডারবান্ধব’ শ্রম আইন বাতিল, হিজবুত তাওহীদ নিষিদ্ধসহ সাত দফা দাবি আলেমদের

জাতীয় উলামা-মাশায়েখ কনভেনশনে সাত দফা দাবি; কুরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন না করা ও মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার আহ্বান

by ABDUR RAHMAN
হিজবুত তাওহীদ নিষিদ্ধসহ সাত দফা দাবি আলেমদের

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬-এর ‘ট্রান্সজেন্ডারবান্ধব’ হিসেবে চিহ্নিত সংশ্লিষ্ট ধারা বাতিল এবং হিজবুত তাওহীদকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে ঈমান-আকিদা সংরক্ষণ কমিটি। একই সঙ্গে কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করা, মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করাসহ সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় উলামা-মাশায়েখ কনভেনশনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় নেতারা এসব দাবি জানান।

মাওলানা আব্দুল আউয়াল পীর সাহেব ডিআইটির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কনভেনশনে যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন মুফতি সুলতান মহিউদ্দীন ও মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও শায়খে চরমোনাই মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। বিশেষ আলোচক ছিলেন পাকিস্তানের মাওলানা ইলিয়াস গুম্মান।

কনভেনশনে আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর, মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, আল্লামা নুরুল ইসলাম অলিপুরী, মুফতি মুহাম্মদ আবুল মালেক, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী পীর সাহেব দেওনা, মুফতি জসিম উদ্দিন হাটহাজারী, হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা শায়েখ সাজিদুর রহমানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আলেমরা বক্তব্য দেন।

শ্রম আইন বাতিলের দাবি

কনভেনশনে বক্তারা সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬-এ থাকা ‘জেন্ডার’, ‘জেন্ডার পরিচয়’ বা ‘লিঙ্গ পরিচয়’, ‘জেন্ডার অভিব্যক্তি’, ‘জেন্ডার সংবেদনশীলতা’ এবং ‘জেন্ডারভিত্তিক অন্যান্য আচরণ’–সংক্রান্ত পরিভাষার বিষয়ে আপত্তি জানান।

মূল্যবোধ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনের দাবি, এসব পরিভাষার মাধ্যমে দেশে এলজিবিটি ও ট্রান্সজেন্ডার-সংক্রান্ত ধারণাকে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে সংশোধিত শ্রম আইন ২০২৬ বাতিল অথবা সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো বাদ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ন করা হলেও এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা মূল্যবোধ চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

‘দ্বি-লিঙ্গ নীতি’র দাবি

ড. সরোয়ার একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে ‘দ্বি-লিঙ্গ নীতি’ চালুর দাবি জানান। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি নীতি, নথি, ফরম ও পরিচয়পত্রে জন্মগত জৈবিক লিঙ্গকে ভিত্তি করে নারী ও পুরুষ—এই দুই শ্রেণিকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি নথিতে ‘জেন্ডার’ শব্দ বা সংশ্লিষ্ট পরিভাষার পরিবর্তে জৈবিক লিঙ্গ বোঝাতে ‘লিঙ্গ’ শব্দ ব্যবহারের দাবি জানানো হয়। ‘জেন্ডারবাদ’কে চরমপন্থা হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তোলা হয়েছে।

ড. সরোয়ারের ভাষ্য, বাংলাদেশে বিভিন্ন আইন, সংস্কার প্রস্তাব, সরকারি নীতি ও শিক্ষা কার্যক্রমে ‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির নামে এলজিবিটি-বান্ধব ধারণা যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

হিজবুত তাওহীদ নিষিদ্ধের দাবি

কনভেনশনে হিজবুত তাওহীদকে নিষিদ্ধ করার দাবিও জোরালোভাবে উঠে আসে।

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা শায়েখ সাজিদুর রহমান বলেন, হিজবুত তাওহীদ দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর মতবাদ প্রচারের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে বলে তারা মনে করেন। সংগঠনটির কার্যক্রম দেশের শান্তি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ইসলামী আকিদা-বিশ্বাসের জন্য হুমকি—এমন দাবি করে তিনি তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান।

কুরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন না করার দাবি

বক্তারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধ, ঈমান-আকিদা ও ইসলামী চেতনা রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তাদের দাবির মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন বা নীতি গ্রহণ না করা এবং মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়ও রয়েছে।

তারা আরও বলেন, বিভিন্ন নামে ও মতাদর্শে পরিচালিত যেসব কর্মকাণ্ডকে তারা ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী মনে করেন, সেগুলোর বিষয়ে আলেম-ওলামা, ইসলামী চিন্তাবিদ ও ধর্মপ্রাণ জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে সচেতন হতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ

ড. সরোয়ার বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, ওই সময়ে এলজিবিটি-সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচিতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল।

তার দাবির মধ্যে ছিল ঈদ শোভাযাত্রায় ইউনিকর্ন প্রদর্শন, নববর্ষের ড্রোন শোতে ‘গে এঞ্জেল’ প্রদর্শন, বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবে এলজিবিটি অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা, ‘মৈত্রীযাত্রা’য় বিভিন্ন ব্যক্তির অংশগ্রহণ, ‘অদম্য নারী পুরস্কার ২০২৫’ প্রদান, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার প্রবেশপথে রংধনু-সদৃশ স্থাপনা এবং শ্রম আইন সংস্কারের মতো বিষয়।

এসব ঘটনাকে তিনি এলজিবিটি-বান্ধব নীতি প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কনভেনশনে উপস্থাপিত বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।

শিক্ষা নীতি নিয়েও আপত্তি

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতের ‘ইনক্লুসিভ শিক্ষা’ এবং ‘Play Lab’ মডেল নিয়েও আপত্তি জানান ড. সরোয়ার।

তার দাবি, পূর্বে আলোচিত ‘শরীফ-শরীফা’ গল্পের সঙ্গে যে ‘Gender Transformative Approach’-এর সম্পর্ক রয়েছে, একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি Play Lab মডেলেও রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘জেন্ডার’ ও ‘ইনক্লুসিভ’ পরিভাষার ব্যবহারকে তারা এলজিবিটি-বান্ধব নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করেন। এ বিষয়ে ভিন্নমত থাকলে প্রকাশ্য বিতর্কের আহ্বানও জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক নীতির উদাহরণ

কনভেনশনে ড. সরোয়ার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নীতির উদাহরণ তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় নথি ও ফরমে নারী-পুরুষের বাইরে অন্য কোনো লিঙ্গের স্বীকৃতি নেই এবং জৈবিক লিঙ্গকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নথিতে ‘জেন্ডার’ শব্দের পরিবর্তে ‘সেক্স’ ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়েছে এবং ‘Gender Identity’-কে জৈবিক লিঙ্গের বিকল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

রাশিয়া, চীন, তুরস্ক ও মালয়েশিয়াসহ ওআইসি ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জেন্ডারবাদের বিরোধী বলেও দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থানে থাকা পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার আহ্বান

কনভেনশনের সভাপতি মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, ইসলামী মূল্যবোধ ও সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রেখে সমাজে নৈতিকতা, শালীনতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষায় রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা-বিশ্বাস সংরক্ষণে জাতীয় পর্যায়ে গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বানও জানান তিনি।

কনভেনশনে মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা মাহবুবুল্লাহ কাসেমী, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মুফতি আবু সাঈদ নোমান, মুফতি জাবের কাসেমীসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।

সব মিলিয়ে, কনভেনশনে সংশোধিত শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা বাতিল, হিজবুত তাওহীদ নিষিদ্ধ, কুরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন না করা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করাসহ ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকেন্দ্রিক একাধিক দাবি তুলে ধরা হয়।

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ