আলিফ হত্যা: তৃতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্য, চিন্ময়ের জামিন ও সময়ের আবেদন খারিজ

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন আইনজীবী ফরিদুল আলম; মামলায় ২৭ আসামি কারাগারে, পলাতক ১২

by ABDUR RAHMAN
আলিফ হত্যায় চিন্ময়ের জামিন ও সময়ের আবেদন খারিজ

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

চট্টগ্রামে আলোচিত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে মামলার অন্যতম আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন এবং তৃতীয় সাক্ষীকে জেরার জন্য সময় চেয়ে আসামিপক্ষের করা পৃথক দুটি আবেদনও খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।

বিজ্ঞাপন
banner

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার তৃতীয় সাক্ষী অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জবানবন্দি দেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফজলে খোদা মোহাম্মদ নাজির তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ও আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী জানান, ফরিদুল আলম মামলার তৃতীয় সাক্ষী এবং তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।

সাক্ষ্যে ফরিদুল আলম বলেন, ঘটনার সময় তিনি কমলা ও নীল রঙের পোশাক পরিহিত দুজনসহ কয়েকজনকে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করতে দেখেছেন। পরে আইনজীবী ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আলিফকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরও জানান, ওই দিন এর আগেও একবার সাইফুল ইসলাম আলিফের ওপর হামলার চেষ্টা হয়েছিল। তখন উপস্থিত লোকজন সম্মিলিতভাবে হামলাকারীদের নিবৃত্ত করেন।

সাক্ষ্যগ্রহণের পর উপস্থিত ও পলাতক আসামিদের পক্ষে থাকা আইনজীবীরা ফরিদুল আলমকে জেরা করেন। তবে মামলার প্রধান আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষে তাঁকে জেরা করা হয়নি।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী আদালতে জানান, মামলার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তাঁরা উচ্চ আদালতে আবেদন করেছেন। ওই আবেদনের এখনো শুনানি হয়নি। বিষয়টি জানিয়ে তৃতীয় সাক্ষীকে জেরার জন্য সময় চেয়ে আবেদন করা হয়।

তবে শুনানি শেষে আদালত সময় চেয়ে করা আবেদনটি নামঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষে করা জামিন আবেদনও খারিজ করে দেন আদালত।

এদিন শুনানির সময় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ভার্চুয়ালি আদালতে হাজির করা হয়। অন্য আসামিদের কারাগার থেকে কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে তাঁদের আবার কারাগারে পাঠানো হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আরও একজন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা হলেও সময়ের অভাবে তাঁর সাক্ষ্যগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী ধার্য তারিখে ওই সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হবে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন, নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের বাবা এর আগে রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁর জেরা শেষ করার জন্য আসামিপক্ষ, বিশেষ করে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষ থেকে প্রায় ছয়বার সময় চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সাক্ষীর জেরাও এখনো শেষ হয়নি।

তিনি বলেন, তৃতীয় সাক্ষীকে জেরার জন্যও এদিন সময় চাওয়া হয়েছে। বারবার সময়ের আবেদন করে বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত করার প্রবণতা মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করছে।

রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত ও নির্ধারিত সময়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে মামলাটি নিষ্পত্তির দিকে এগিয়ে নিতে চায় বলেও জানান তিনি।

এর আগে গত ২০ জুলাই মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী অ্যাডভোকেট শহিদুল আলম রাহাত আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাঁর জেরা শেষ করার জন্য ২০ আগস্ট দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।

মামলার পটভূমি

২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। ওই দিন চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণ থেকে প্রিজন ভ্যানে চিন্ময়কে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর সমর্থকেরা বিক্ষোভ করেন।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে কারাগারে নিয়ে যায়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা আদালত সড়কে থাকা কয়েকটি মোটরসাইকেল ও যানবাহন ভাঙচুর করেন। পরে আদালতের সাধারণ আইনজীবী ও কর্মচারীরা তাঁদের ধাওয়া করেন।

ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে রঙ্গম কনভেনশন হল সড়কে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনায় ২৯ নভেম্বর নগরীর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন সাইফুল ইসলাম আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন। মামলায় ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১৫ থেকে ১৬ জনকে আসামি করা হয়। মামলার আসামিদের সবাই নগরীর রঙ্গম কনভেনশন হলসংলগ্ন বান্ডেল সেবক কলোনির বাসিন্দা বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি) মাহফুজুর রহমান ৩৮ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে প্রধান আসামি করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় চিন্ময় কৃষ্ণ দাস পুলিশ হেফাজতে ছিলেন। জামিন আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর তিনি আদালত প্রাঙ্গণে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং তাঁর বক্তব্যের কারণে অন্য আসামিরা উত্তেজিত হয়ে আইনজীবীর ওপর হামলা চালায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, হুকুমদাতা হিসেবে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আগে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জবানবন্দি ও জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে।

মামলার বর্তমান অবস্থা

এই মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ২৭ জন আসামি কারাগারে রয়েছেন। ১২ জন আসামি পলাতক রয়েছেন।

তৃতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলার বিচারিক কার্যক্রম আরও এক ধাপ এগিয়েছে। তবে সাক্ষীদের জেরা শেষ করা এবং পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের পর মামলাটি নিষ্পত্তির দিকে কত দ্রুত এগোয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ