‘ছয় মাসে সরকারের সুস্পষ্ট সাফল্য নেই’, বিএনপি সরকারকে জামায়াতের কঠোর মূল্যায়ন

গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, ব্যাংকিং খাত ও পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থতার অভিযোগ; সরকারের প্রতি ৮ দফা আহ্বান

by ABDUR RAHMAN
বিএনপি সরকারকে জামায়াতের কঠোর মূল্যায়ন

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দৃশ্যমান কোনো সাফল্য আসেনি বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, ব্যাংকিং খাত, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকারের কার্যক্রমে হতাশা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ছয় মাস পার হওয়ার পর সরকারের কর্মকাণ্ডকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নয়, বাস্তব ফলাফল, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের কাছে জবাবদিহির মানদণ্ডে মূল্যায়নের সময় এসেছে।

গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রশ্ন

জামায়াতের মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি। মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণ স্পষ্ট রায় দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেটের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যবধান আড়াই কোটিরও বেশি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল এবং প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার শেষ করার বিধান ছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের কাঠামো কার্যকর হয়নি। সরকার পরবর্তীতে সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পথে এগিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জ্বালানি সংকটে ‘কাঠামোগত ঘাটতি’

গ্যাস ও জ্বালানি সংকটকে সাময়িক সমস্যা না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে জামায়াত।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থাকছে।

এই সংকটের প্রভাব শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে পড়ছে বলে দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে, প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন।

কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহের বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি বলেন, মার্চে বাংলাদেশকে দুটি স্পট এলএনজি কার্গো প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ২৮ ডলার ও ২৩ দশমিক ০৮ ডলার দরে কিনতে হয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশের নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা নিয়েও উদ্বেগ

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তুলে জামায়াতের এই নেতা সরকারি ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে মার্চ-এপ্রিল সময়ে ৬০৫টি হত্যা, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে মব সহিংসতার ৬৯ থেকে ৮০টি ঘটনায় ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত হওয়ার তথ্যও তিনি উল্লেখ করেন।

জামায়াতের মূল্যায়নে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতে চাপ

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেছে জামায়াত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের বরাত দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুন ২০২৬-এ দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬১ শতাংশে ছিল। আগের বছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

তার দাবি, মূল্যস্ফীতির চাপ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণেও সরকার কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।

প্রশাসন ও নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ

প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাবের অভিযোগও তুলেছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, মেধা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিভিন্ন নিয়োগ, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ইউজিসি চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার দাবি জানান।

পররাষ্ট্রনীতিতে ‘কৌশলগত দুর্বলতা’

সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হিসেবে ঘোষণা করলেও ছয় মাসে সেটিকে সুস্পষ্ট ও সমন্বিত কাঠামোয় রূপ দেওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গুম প্রতিরোধ আইন নিয়েও আপত্তি

গুম প্রতিরোধে সরকারের প্রস্তাবিত আইন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড রেমেডি অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর কয়েকটি বিধান নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। টিআইবিও অংশীজনদের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের প্রতি জামায়াতের ৮ দফা আহ্বান

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি আটটি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায় জামায়াত। এগুলো হলো—

১. গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ।
২. গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ।
৩. প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা।
৪. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করা।
৫. পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো প্রকাশ।
৬. দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া।
৭. ব্যাংকিং খাতে আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা।
৮. গুম প্রতিরোধ আইনে গোপন আটক বা অস্বীকৃত হেফাজতের সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করা।

দুটি ইতিবাচক দিকও দেখছে জামায়াত

সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি দুটি বিষয়কে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। তবে এর কৃতিত্ব সরকারকে না দিয়ে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখেন তিনি।

অন্যদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের প্রস্তাবের পর সরকার ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করায় সেটিকেও একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

সবশেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণ সরকারকে সমস্যার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য নয়, সমাধান দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দিয়েছে। আগামী দিনে সরকার দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে না পারলে জনগণের হতাশা ও আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ