‘বলিউডি কায়দায় ইতিহাস বিকৃতি’, ভারতের অপারেশন সিঁদুরের ডকুমেন্টারি নিয়ে পাকিস্তানের ক্ষোভ

ডকুমেন্টারিতে বাছাই করা সাক্ষাৎকার ও সিনেমাটিক উপস্থাপনার মাধ্যমে যুদ্ধের বাস্তবতা বদলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ আইএসপিআরের

by ABDUR RAHMAN
ভারতের অপারেশন সিঁদুরের ডকুমেন্টারি নিয়ে পাকিস্তানের ক্ষোভ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘাত নিয়ে নির্মিত ভারতের নতুন একটি ডকুমেন্টারিকে ‘তথ্যগতভাবে ভুল’ ও ‘অতিরঞ্জিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) অভিযোগ করেছে, ডকুমেন্টারিতে বাছাই করা সাক্ষাৎকার, আবেগঘন বর্ণনা ও সিনেমাটিক উপস্থাপনার মাধ্যমে যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহকে ভারতের অনুকূলে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
banner

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আরও দাবি করেছে, ডকুমেন্টারিটি বাস্তব ঘটনাকে নতুনভাবে উপস্থাপনের পাশাপাশি যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে এমন একটি বয়ান তৈরি করেছে, যার সঙ্গে তাদের দাবি করা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল নেই। এ নিয়ে ১৭ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে আইএসপিআর তাদের অবস্থান তুলে ধরে।

চার দিনের সংঘাতের পর নতুন বিতর্ক

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুক হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ে। ভারত ওই হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে। পরে ৭ মে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে সামরিক হামলা চালায়।

এর জবাবে পাকিস্তানও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়। কয়েক দিনের সংঘাতের পর ১০ মে দুই দেশ লড়াই বন্ধে সম্মত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এ সংঘাতকে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংকটের সবচেয়ে গুরুতর সামরিক মুখোমুখিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়।

এই সংঘাতের প্রায় এক বছর পর ভারতীয় পক্ষ থেকে প্রকাশিত নতুন ডকুমেন্টারি ঘিরে দুই দেশের পুরোনো বিরোধ আবারও আলোচনায় এসেছে।

‘ইতিহাস নিজের মতো করে লেখার চেষ্টা’

পাকিস্তানের আইএসপিআরের অভিযোগ, ডকুমেন্টারিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’কে ভারতের একতরফা ও শতভাগ সফল সামরিক অভিযান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর দাবি, এ ধরনের উপস্থাপনা যুদ্ধের প্রকৃত ফলাফলকে আড়াল করে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের জন্য একটি অনুকূল বয়ান তৈরির চেষ্টা।

আইএসপিআর বলেছে, ডকুমেন্টারিতে আবেগঘন বক্তব্য ও চলচ্চিত্রের মতো দৃশ্যায়নের পাশাপাশি নির্বাচিত সাক্ষাৎকার ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু সাক্ষাৎকারের বক্তব্যও প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন বা বিকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, ‘বলিউডধর্মী’ উপস্থাপনা দিয়ে যুদ্ধের প্রকৃত ঘটনা, ক্ষয়ক্ষতি কিংবা সামরিক ফলাফল পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

সময়ের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন

ডকুমেন্টারিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিলের একটি বক্তব্যের সঙ্গে ২২ এপ্রিলের পেহেলগাম হামলার যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে আইএসপিআর।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দাবি, এই দুই ঘটনার মধ্যে এমন সম্পর্ক দেখানোর কোনো ভিত্তি নেই এবং বিষয়টিকে তারা ষড়যন্ত্রমূলক ব্যাখ্যা হিসেবে দেখছে।

এ ছাড়া পেহেলগাম হামলার কথিত হামলাকারীদের শনাক্ত ও হত্যার সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তান। আইএসপিআর বলেছে, ভারত যদি দাবি করে থাকে যে হামলায় জড়িত তিন ব্যক্তিকে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই শনাক্ত ও হত্যা করা হয়েছিল, তাহলে ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় কাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল—সে প্রশ্নের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি

ভারতীয় ডকুমেন্টারিতে অভিযান শতভাগ সফল হয়েছে—এমন দাবি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে পাকিস্তান তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

আইএসপিআরের দাবি, সংঘাতের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের হামলা প্রতিহত করে এবং আটটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। এরপর পাকিস্তান ‘অপারেশন বানইয়ান-উল-মারসুস’ নামে পাল্টা অভিযান চালায় বলে দাবি করেছে দেশটির সামরিক বাহিনী।

পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, ওই পাল্টা অভিযানে ফাতাহ রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্র ব্যবহার করে ভারতের ২৬টি সামরিক স্থাপনায় আঘাত করা হয়।

তবে এসব সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিগুলো নিয়ে দুই দেশের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। ফলে এগুলোকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ডকুমেন্টারির বক্তব্যেই ‘বিরোধ’ দেখছে পাকিস্তান

আইএসপিআর বলেছে, ডকুমেন্টারিতে পাকিস্তানের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘ সময় সংঘর্ষ এবং ভারতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার কথাও সেখানে উঠে এসেছে বলে পাকিস্তানের দাবি।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মতে, ডকুমেন্টারিতে থাকা এসব তথ্যই ভারতের ‘নিরঙ্কুশ সামরিক আধিপত্যের’ দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষের সাম্প্রতিক উপস্থাপনায় ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সামরিক সাফল্য, গোয়েন্দা প্রস্তুতি ও অভিযানের পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে দুই দেশের বয়ানে এখনও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

যুদ্ধবিরতি নিয়েও ভিন্ন বয়ান

সংঘাত কীভাবে শেষ হয়েছিল, তা নিয়েও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ভারতীয় ডকুমেন্টারির বর্ণনার সমালোচনা করেছে।

আইএসপিআরের ভাষ্য, দুই দেশের সামরিক অপারেশন পরিচালনাবিষয়ক মহাপরিচালক (ডিজিএমও) পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সম্মতির মাধ্যমে লড়াই বন্ধ হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকা রাখার কথা জানিয়েছিল।

পাকিস্তানের দাবি, এ কারণে যুদ্ধবিরতিকে ভারতের একতরফা বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়। ২০২৫ সালের সংঘাতের অবসান মূলত দুই পক্ষের সামরিক যোগাযোগের মাধ্যমেই হয়েছিল—এটাই তাদের বক্তব্য।

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বার্তা

বিবৃতির শেষ দিকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আগ্রহী। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড রক্ষায় তারা প্রস্তুত রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে।

ভবিষ্যতে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার ‘দৃঢ় ও সিদ্ধান্তমূলক’ জবাব দেওয়া হবে—এমন বার্তাও দিয়েছে আইএসপিআর।

২০২৫ সালের সংঘাতের এক বছরের বেশি সময় পর নতুন ডকুমেন্টারি নিয়ে পাকিস্তানের এই প্রতিক্রিয়া ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের বয়ান নিয়ে চলমান প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই সামনে এনেছে। একই সংঘাতকে ভারতীয় পক্ষ একভাবে এবং পাকিস্তানি পক্ষ অন্যভাবে উপস্থাপন করছে। ফলে যুদ্ধের সামরিক ফলাফল, ক্ষয়ক্ষতি ও যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপট নিয়ে দুই দেশের দাবির মধ্যে পার্থক্য এখনও স্পষ্ট।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ