নিজস্ব প্রতিবেদক | হুদহুদ নিউজ
দেশে শরিয়াহভিত্তিক নৈতিক ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা, হালাল শিল্পের বিকাশ এবং দেশীয় ব্যবসাকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ইসলামিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BICCI)-এর প্রথম সদস্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর পল্টন মোড়ের ভুইয়া টাওয়ারের ডি.সি.সি. হলে আয়োজিত এ সম্মেলনে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে নতুন সদস্যদের পরিচিতি, চেম্বারের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন, আসন্ন কর্মসূচি ঘোষণা এবং এডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
শরিয়াহভিত্তিক নৈতিক ব্যবসার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ইসলামিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ইসলামী শরিয়াহর মূলনীতির আলোকে দেশের ব্যবসায়ী সমাজকে সংগঠিত করা এবং একটি নৈতিক ও স্বচ্ছ ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা।
একই সঙ্গে দেশীয় ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সহযোগিতার সেতু তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে নৈতিকতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বক্তারা।
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গ নীতিমালার দাবি
সম্মেলনের মূল বক্তব্যে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের বিকাশের পাশাপাশি এ খাতের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের জন্য উপযোগী নীতিগত কাঠামো আরও শক্তিশালী করা গেলে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ইসলামী অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মত দেওয়া হয়।
হালাল শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা
সম্মেলনে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়। খাদ্য, প্রসাধনী, ওষুধ, লজিস্টিকসসহ বিভিন্ন খাতে সমন্বিত হালাল শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।
তবে শুধু হালাল পণ্য উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হালাল সনদায়ন, মাননিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা মনে করেন, একটি কার্যকর ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল সনদায়ন ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশ্বের বড় হালাল বাজারগুলোতে প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়বে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা
BICCI-এর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী সংগঠন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তুলে ধরার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
এ ছাড়া হালাল অর্থনীতি ও হালাল শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের কাছে গঠনমূলক প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শুরু হচ্ছে এডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া
সম্মেলনে নতুন সদস্যদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে BICCI-এর এডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, চেম্বারের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে একটি দক্ষ, সৎ, প্রতিনিধিত্বশীল ও পেশাদার কাঠামো প্রয়োজন। নতুন সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
এডহক কমিটি গঠনসংক্রান্ত অধিবেশনে বক্তব্য দেন মাহমুদুল ইসলাম তুষার।
‘BICCI শুধু সংগঠন নয়, ব্যবসায়িক বিপ্লবের সূচনা’
সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ ও কি-নোট বক্তব্য উপস্থাপন করেন BICCI-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব এম. মুফাজ্জল ইবনে মাহফুজ।
কি-নোট বক্তব্যে বলা হয়, ‘BICCI কেবল একটি সংগঠন নয়—এটি ব্যবসায়িক বিপ্লবের সূচনা।’
শরিয়াহভিত্তিক নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি স্বাবলম্বী, সুসংগঠিত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সদস্যরা নিজেদের মতামত ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
১২ সেপ্টেম্বর হালাল সনদায়ন নিয়ে গোলটেবিল
অনুষ্ঠানে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ‘হালাল সার্টিফিকেশন কী এবং কেন প্রয়োজন’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
হালাল পণ্যের মান, সনদায়ন প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর গুরুত্ব নিয়ে ওই আয়োজনে আলোচনা হবে বলে জানানো হয়।
যারা ছিলেন সম্মেলনে
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন BICCI-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এ. ফাত্তাহ আসিফ। স্বাগত বক্তব্য দেন সুলতান মাহমুদুর রহমান ও সুলতান মাহমুদ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ইনসাফ-এর সম্পাদক সৈয়দ মাহফুজ খন্দকার। অনুষ্ঠানে ইসলামিক স্মার্ট সিটির চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিকও বক্তব্য দেন।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে তিনি BICCI-এর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও নৈতিক, স্বচ্ছ ও সহযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে চেম্বারের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সদস্যদের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে BICCI-এর কার্যক্রমে অংশ নিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
দোয়া ও মোনাজাতে সম্মেলনের সমাপ্তি
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে BICCI-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আব্দুর রহমান দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন। এর মধ্য দিয়ে চেম্বারের প্রথম সদস্য সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
সম্মেলনের আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভবিষ্যতে সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, হালাল শিল্পের বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং শরিয়াহভিত্তিক নৈতিক ব্যবসায়িক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিক কর্মসূচি নেওয়া হবে।

