মসজিদ রক্ষায় এক পায়ে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই নেপালি যুবককে মক্কায় সম্মান ও উমরাহর সুযোগ

ভাইরাল ভিডিও দেখে সৌদি দাতাদের উদ্যোগ; বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে উমরাহ পালন, কৃত্রিম পা দেওয়ারও দায়িত্ব নিল সংগঠন

by ABDUR RAHMAN
মসজিদ রক্ষায় এক পায়ে দাঁড়িয়েছিলেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

এক পায়ে ভর দিয়ে, হাতে ক্রাচ ও লাঠি। সামনে একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মসজিদ রক্ষায় তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন নেপালের শেখ রহেমুল্লাহ হয়তো ভাবেনওনি—এই সাহসিকতার গল্প একদিন তাকে নিয়ে যাবে পবিত্র মক্কায়।

বিজ্ঞাপন
banner

নেপালের রওতাহাট জেলার রামপুরের ৩২ বছর বয়সী রহেমুল্লাহর সেই ভিডিও জানুয়ারির শেষ দিকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক পায়ে দাঁড়িয়ে ক্রাচ ও লাঠির সাহায্যে তিনি একটি মসজিদে হামলার চেষ্টা করা একদল উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিকে প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন।

ভিডিওটি দ্রুত নেপালের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের নজরে আসে। তার সাহসিকতার ঘটনা বিশেষভাবে আলোড়ন তোলে সৌদি আরবের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ও সমাজকর্মীদের মধ্যে। এরপর ভাইরাল ভিডিওটির পেছনের মানুষটিকে খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেন কয়েকজন সৌদি অ্যাক্টিভিস্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মী।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তারা রহেমুল্লাহর সন্ধান পান। আর সেখান থেকেই তার জীবনে শুরু হয় এক অভাবনীয় অধ্যায়।

গত ৫ আগস্ট সৌদি দাতা ও আয়োজকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছান রহেমুল্লাহ। জীবনে কখনো উমরাহ পালনের সুযোগ হবে—এমনটা তিনি নিজেও ভাবেননি। কিন্তু মসজিদ রক্ষায় তার সাহসিকতার গল্পই শেষ পর্যন্ত তাকে পবিত্র মক্কায় নিয়ে যায়।

সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর স্থানীয় নাগরিক ও বাসিন্দারা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দেওয়া হয় বিভিন্ন উপহারও। মক্কায় অবস্থানকালে বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে উমরাহ পালন করেন রহেমুল্লাহ।

তার জন্য এই সফর শুধু একটি ধর্মীয় ইবাদত পালনের সুযোগ ছিল না; বরং নিজের জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও পাওয়া এক অনন্য স্বীকৃতি।

রহেমুল্লাহর একটি পা হারানো। চলাফেরায় তাকে ক্রাচ ও লাঠির ওপর নির্ভর করতে হয়। তার উমরাহ সফরের পাশাপাশি হারানো পায়ের জন্য কৃত্রিম অঙ্গ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বাদার অ্যাসোসিয়েশন তার জন্য কৃত্রিম পা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। ফলে সৌদি আরবের এই সফর তার কাছে শুধু মক্কা-মদিনা দেখার কিংবা উমরাহ পালনের স্মৃতি হয়ে থাকছে না; বরং ভবিষ্যতে আরও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে।

সৌদি আরবে রহেমুল্লাহ ও তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন ভারতের কেরালার তরুণ মুসলিম কনটেন্ট নির্মাতা মোহাম্মদ রাফি। সফরের বিভিন্ন সময়ে তিনি তাদের সঙ্গও দেন।

আরব নিউজকে রাফি জানান, কয়েকজন সৌদি ভাইয়ের সহযোগিতায় রহেমুল্লাহ উমরাহ পালনের সুযোগ পেয়েছেন। তার ভাষায়, প্রথমত আল্লাহর কৃপা এবং এরপর সৌদি ভাইদের সহযোগিতার কারণেই এই সফর সম্ভব হয়েছে।

মক্কা ও মদিনায় রহেমুল্লাহ এবং তার পরিবার যে আতিথেয়তা পেয়েছেন, তাতে তারা অত্যন্ত আনন্দিত বলেও জানান রাফি।

তিনি বলেন, উমরাহ পালনের সময় রহেমুল্লাহর আনন্দ ছিল বর্ণনাতীত। তার পুরো গল্পটি ধৈর্য, দৃঢ়তা ও ঈমানের একটি অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

রাফির মতে, এই সফরের স্মৃতি রহেমুল্লাহ কখনো ভুলবেন না।

সৌদি আরবে প্রায় ১০ দিনের সফর শেষে গত ১৪ আগস্ট বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে নেপালের উদ্দেশে রওনা হন রহেমুল্লাহ।

সঙ্গে ছিল মক্কা ও মদিনার স্মৃতি, উমরাহ পালনের অভিজ্ঞতা এবং সৌদি দাতা ও এই সফরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

একটি ভাইরাল ভিডিও দিয়ে যে গল্পের শুরু, শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে উঠেছে সাহসিকতা, বিশ্বাস ও মানবিকতার এক অনন্য গল্প। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে একটি মসজিদ রক্ষায় দাঁড়িয়ে যাওয়া রহেমুল্লাহর সেই মুহূর্তই তাকে এনে দিয়েছে এমন একটি সুযোগ, যা তার নিজের ভাষায় হয়তো ছিল কল্পনারও বাইরে।

রহেমুল্লাহর ঘটনা সেই বৃহত্তর উমরাহ অভিজ্ঞতার মধ্যেই একটি আলাদা মানবিক গল্প—যেখানে একটি মসজিদ রক্ষার সাহসিকতা তাকে এনে দিয়েছে পবিত্র মক্কায় ইবাদতের সুযোগ এবং ভবিষ্যতে কৃত্রিম পা পাওয়ার সম্ভাবনা।

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ