ইসলামবিদ্বেষ ও বর্ণযুদ্ধ, ইলন মাস্কের নতুন রাজনীতি

এক্স প্ল্যাটফর্মে ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ ও ‘হোয়াইট জেনোসাইড’ তত্ত্ব প্রচারের অভিযোগ; ট্রাম্পসহ ইউরোপের ডানপন্থী শক্তির প্রতি সমর্থন নিয়েও সমালোচনা

by ABDUR RAHMAN
ইসলামবিদ্বেষ ও বর্ণযুদ্ধের ডিজিটাল কারিগর ইলন মাস্কের নতুন রাজনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

বিশ্বের অন্যতম ধনী উদ্যোক্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের মালিক ইলন মাস্ককে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ‘মিডল ইস্ট আই’-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, মাস্কের রাজনৈতিক অবস্থান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মকাণ্ড শুধু বিতর্কিত মতামত প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বর্ণগত বিভাজন, ইসলামবিদ্বেষ এবং উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে।

বিজ্ঞাপন
banner

নিবন্ধটির লেখক আমিনা শরিফ মাস্ককে সমসাময়িক উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি ও জাতিগত উত্তেজনার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তবে এসব বিষয় নিয়ে মাস্কের বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে সমালোচনাই প্রতিবেদনের মূল ভিত্তি।

সম্প্রতি ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর প্রধান সম্পাদক জ্যানি মিন্টন বেডোসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাস্ককে ইসলাম ও মুসলিমদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। এ সময় তিনি সরাসরি ইসলামবিরোধিতার অভিযোগ খণ্ডন করার পরিবর্তে মুসলিম ও অভিবাসীদের প্রসঙ্গে ধর্ষণ, হত্যা, পশ্চিমা মূল্যবোধের বিরোধিতা এবং আইন চাপিয়ে দেওয়ার মতো বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।

সমালোচকদের দাবি, মাস্কের এসব বক্তব্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চরম ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রচারিত ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের মিল রয়েছে। তাদের মতে, মুসলিমদের একটি অভিন্ন ও সহিংস গোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি পশ্চিমা সমাজে তাদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা আরও জোরালো করছেন।

মাস্কের রাজনৈতিক বক্তব্যের আরেকটি বিতর্কিত দিক হিসেবে ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট থিওরি’ ও ‘হোয়াইট জেনোসাইড’-এর মতো তত্ত্ব প্রচারের বিষয়টি সামনে এনেছে নিবন্ধটি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে মাস্ক প্রায় নিয়মিতভাবে এসব বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করেছেন। তার একটি পোস্টে শ্বেতাঙ্গরা দ্রুত সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে—এমন বক্তব্য দেওয়া হয়, যা বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

বিশ্লেষকের মতে, এ ধরনের বক্তব্য জনসংখ্যাগত পরিবর্তনকে স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে ‘শ্বেতাঙ্গদের অস্তিত্বের সংকট’ হিসেবে উপস্থাপন করে। এর ফলে সমাজে জাতিগত বিভাজন ও ভীতির রাজনীতি আরও জোরালো হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

মাস্কের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টিও উঠে এসেছে বিশ্লেষণে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে তার আর্থিক সহায়তার কথা উল্লেখ করে নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির প্রতিও মাস্ক প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।

এর মধ্যে ফ্রান্সের ন্যাশনাল র‍্যালি এবং জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডির মতো দল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া এক্স প্ল্যাটফর্মে পরিচিত কয়েকজন উগ্র ডানপন্থী ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েও মাস্ক সমালোচিত হয়েছেন। সমালোচকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মালিক হিসেবে তার নেওয়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মতাদর্শের বিস্তারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

মাস্ক বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্য সামাজিক সংঘাত ও ‘গৃহযুদ্ধ’-এর আশঙ্কা নিয়ে মন্তব্য করেছেন বলেও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখকের দাবি, এ ধরনের বক্তব্য অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতির নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের পরিবর্তে তার অনুসারীদের মধ্যে ভয়, বিভাজন ও সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে অভিবাসন ও জাতিগত পরিবর্তন নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন ঘটনাকে ঘিরে তার পোস্ট ও মন্তব্যও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

নিবন্ধে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বিভিন্ন ঘটনা ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা জাতিগত উত্তেজনা বাড়াতে পারে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইলন মাস্ককে শুধু একজন ধনী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হিসেবে বিবেচনা করলে তার রাজনৈতিক প্রভাবের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

মাস্কের বিপুল সম্পদ, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মালিকানা এবং বিপুলসংখ্যক অনুসারীর কারণে তার বক্তব্য দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তার রাজনৈতিক মন্তব্য ও বিভিন্ন মতাদর্শকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত সাধারণ কোনো ব্যক্তির বক্তব্যের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

নিবন্ধটির লেখকের মতে, মাস্ক নিজেকে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ধরন নিয়ে উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। বিশেষ করে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য এবং ইসলামবিদ্বেষী ধারণার বিস্তারে তার প্রভাব ভবিষ্যতে সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

তবে মাস্কের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে এসব অভিযোগ মূলত সমালোচক ও বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন। এগুলোকে তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত কোনো আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ