অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর একটি বড় অংশ দেশ ছাড়েন। তাদের অনেকে ভারতে আশ্রয় নেন। প্রায় দুই বছর পরও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য, সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতা এবং পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছেন বলে দলীয় সূত্রের বরাতে জানিয়েছে বিবিসি বাংলা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত ৭০ জন নেতা অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা রয়েছেন। এর বাইরে মধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীর পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তাও সেখানে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
একপর্যায়ে শুধু সাবেক সংসদ সদস্যদের সংখ্যাই প্রায় ৭০ জন ছিল বলে আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো দাবি করেছে। সহযোগী সংগঠনের নেতা, জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মী, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের যুক্ত করলে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থানকারীর সংখ্যা প্রায় ২০০ জনে পৌঁছেছিল বলেও দলীয় সূত্রের দাবি।
তবে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সবাই এখন আর সেখানে নেই। সূত্রগুলো জানিয়েছে, কলকাতা, শিলিগুড়ি, ত্রিপুরাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় তৃণমূল ও মধ্যম পর্যায়ের এক হাজারের বেশি নেতাকর্মী অবস্থান করলেও তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে নিজেদের সামর্থ্য, পারিবারিক যোগাযোগ ও পরিচিতজনদের সহায়তায় ইউরোপ, আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন।
অনলাইনে চলছে দলীয় কার্যক্রম
ভারত ও অন্যান্য দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন কমিটি পুনর্গঠন, মামলা মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং দলীয় প্রচারণায় যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছেন কয়েকজন নেতা।
বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলা আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রায় সবাই দাবি করেছেন, দেশের বাইরে থেকেও তারা নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন পাঠানোর কাজেও যুক্ত থাকার কথা জানিয়েছেন।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী জানিয়েছেন, এ ধরনের কার্যক্রমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এছাড়া ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের ছোট ছোট দলে দিল্লি গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথাও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বদলে গেছে জীবনযাত্রা
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অনেক নেতার জীবনযাত্রাতেও পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের আর্থিক সহায়তায় জীবনযাপন করছেন। অনেকে পরিবারকে বাংলাদেশে রেখে একা বাসা ভাড়া করে থাকছেন, আবার কয়েকজন মিলে একটি বাসায় থাকার ঘটনাও রয়েছে।
দেশে থাকার সময়কার আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য না থাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে ট্যাক্সি কিংবা গণপরিবহণ ব্যবহারের কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, তিনি ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ভারতে পৌঁছান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতে যাওয়ার পর প্রথম এক বছর তিনি ‘ট্রমা’র মধ্যে ছিলেন এবং আত্মীয়-বন্ধুদের সহায়তায় জীবন কাটিয়েছেন।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব সঠিকভাবেই পালন করেছিলেন।
অন্যদিকে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন জানান, দীর্ঘ সময় তিনি বাংলাদেশেই আত্মগোপনে ছিলেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার পর জায়গা পরিবর্তন করে ভারতে যান।
অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীও জানান, দেশে প্রায় দেড় বছর আত্মগোপনে থাকার সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে অন্তত ১২ বার সিম পরিবর্তন করতে হয়েছিল।
শেখ হাসিনার ফেরার বক্তব্যে নতুন আলোচনা
এদিকে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের সাংবাদিকদের সামনে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে চান। এর আগে একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি।
শেখ হাসিনার এ বক্তব্যের পর ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেও দেশে ফেরার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দলটির কিছু নেতা জানিয়েছেন, তারা দেশে ফেরার এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তবে শেখ হাসিনা ঠিক কবে এবং কীভাবে বাংলাদেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
দলটির নেতাকর্মীরা তাদের বর্তমান অবস্থানকে নিজেদের ভাষায় ‘কৌশলগত কারণে আত্মগোপন’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। দেশের বাইরে অবস্থান করেও রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার দাবি করছেন তারা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

