‘জনগণের প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা যাবে না’—পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ নিয়ে এনসিপির প্রতিবাদ

দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠনের অভিযোগ; নির্বাচিত পরিষদ ছাড়া জনগণের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে না বলে দাবি

by ABDUR RAHMAN
পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ নিয়ে এনসিপির প্রতিবাদ

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিন জেলা পরিষদের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সঙ্গে দ্রুত সরাসরি ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে নির্বাচিত পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়েছে দলটি।

বিজ্ঞাপন
banner

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়। পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে দলটির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনার স্বাক্ষরের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে এনসিপি বলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত অঞ্চল। এ অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অধিকার, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং ন্যায়সংগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে কার্যকর, নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তবে গত ২০ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে এনসিপি। দলটির দাবি, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা পরিষদে বিএনপি ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক মত, সামাজিক শক্তি এবং দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব কার্যত অনুপস্থিত।

এনসিপির মতে, এ ধরনের একতরফা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব জেলা পরিষদগুলোর নিরপেক্ষতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একই সঙ্গে এতে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দলটি আরও বলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় স্বতন্ত্র। এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। রাজনৈতিক দলের সক্রিয় পরিচয়ের বাইরে থেকেও বহু যোগ্য, দক্ষ, সৎ ও জনসম্পৃক্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় উন্নয়ন ও জনকল্যাণে কাজ করছেন। তাই জেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু দলীয় আনুগত্যকে বিবেচনার প্রধান ভিত্তি করা উচিত নয়।

এনসিপির ভাষ্য, যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা, জনসম্পৃক্ততা, স্থানীয় বাস্তবতা এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে জেলা পরিষদ পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো বৈচিত্র্যময় ও সংবেদনশীল অঞ্চলে অতিরিক্ত রাজনৈতিকীকরণ উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি জনগণের মধ্যে বৈষম্য, অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারে।

বিবৃতিতে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর দীর্ঘদিনের অনির্বাচিত অবস্থার বিষয়টিও তুলে ধরে এনসিপি। দলটি জানায়, ১৯৮৯ সালের পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন প্রণয়নের পর ওই বছর একবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যক্ষ ও নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকার মনোনীত বা অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে আসছে।

এনসিপি মনে করে, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের গণতান্ত্রিক অধিকার দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে অনির্বাচিত ও দলীয়ভাবে প্রভাবিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান আর দেখতে চায় না দলটি।

দলটির মতে, অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ সর্বোচ্চ একটি সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা হতে পারে; কোনোভাবেই এটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের বিকল্প নয়। তাই খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে দ্রুত সরাসরি ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এনসিপি আরও দাবি করেছে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থায় দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

দলটি বলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কোনো একক রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের বিষয় নয়; এটি এ অঞ্চলে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষের অধিকার। তাই জেলা পরিষদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব জনগোষ্ঠীর সমান অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়সংগত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সবশেষে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে এনসিপি। দলটির দাবি, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত, নিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক পরিষদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে কার্যকর জনপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ