আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
উত্তরপ্রদেশ: ভারতের উত্তরপ্রদেশের সিদ্ধার্থনগর জেলায় সরকারি জমি দখলের অভিযোগে ৫৯ বছরের পুরোনো একটি মাদরাসার অর্ধেকেরও বেশি অংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে এ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তবে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) জেলার ডোমরিয়াগঞ্জ তহসিলের পিপরা রামলাল গ্রামের ঐতিহাসিক আরাবিয়া জিয়া-উল-উলুম মাদরাসা, যা স্থানীয়ভাবে মক্তব মাদরাসা নামেও পরিচিত, এ অভিযান চালানো হয়।
প্রায় ১৪ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটির সাতটি কক্ষ, একটি দোকান এবং প্রধান হলের অর্ধেক অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রশাসনের এ পদক্ষেপের ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে পড়াশোনা করা প্রায় ৪০০ শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
আদালতের আদেশের ভিত্তিতে উচ্ছেদ
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদরাসাটি প্রথমে ব্যক্তিগত জমিতে নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে এর সামনের খালি সরকারি জমিতে স্থাপনা সম্প্রসারণ করা হয়। ওই অংশকে সরকারি জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
২০২২ সালে গ্রামের পাঁচ বাসিন্দা কথিত সরকারি জমি দখলমুক্ত করার দাবিতে ডোমরিয়াগঞ্জ তহসিলদারের আদালতে আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মাদরাসার তত্ত্বাবধায়ক আবদুল সালাম ওই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে একই বছর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আবেদন করেন। প্রায় তিন বছর ধরে শুনানি চলার পর গত ১৪ আগস্ট ২০২৬ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত তহসিলদারের উচ্ছেদ আদেশ বহাল রাখেন এবং মাদরাসা কর্তৃপক্ষের আবেদন খারিজ করে দেন।
এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কথিত দখল সরিয়ে নেওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থাপনা সরানো হয়নি—এমন দাবি করে মঙ্গলবার সকালে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়।
সকাল ৭টার দিকে ডোমরিয়াগঞ্জের এসডিএম বিবেকানন্দ মিশ্র, ডোমরিয়াগঞ্জের সিও ব্রিজেশ ভার্মা এবং বানসি সিও শিবেন্দু সিংয়ের উপস্থিতিতে অভিযান শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পাঁচটি থানার প্রায় ১০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।
প্রশাসনের অভিযান প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে। এ সময় মাদরাসার সাতটি কক্ষ, একটি দোকান এবং প্রধান হলের অর্ধেক অংশ ভেঙে দেওয়া হয়।
ঘটনাস্থলে এসপি নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ
মাদরাসা ভাঙার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান সমাজবাদী পার্টির ডোমরিয়াগঞ্জের বিধায়ক সৈয়দা খাতুন, দলটির জেলা সভাপতি লালজি যাদবসহ অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী।
তারা মাদরাসা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং অভিযান বন্ধের দাবি জানান। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় এবং একপর্যায়ে সামান্য ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।
এসপি নেতা কামাল আহমেদ খান মাদরাসার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ডোমরিয়াগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্রী প্রকাশ যাদব তাকে বাধা দেন। এ সময় পুলিশ জোর করে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন খান।
জবাবে তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে, যা করার করুন। আপনারা কি আমার গায়ে হাত তুলবেন?’
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশের আরও সদস্য সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে বিধায়ক সৈয়দা খাতুন দলীয় নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকার এবং আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আহ্বান জানান। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেয়।
‘অসাংবিধানিক’ বলছে আম আদমি পার্টি
মাদরাসা উচ্ছেদের ঘটনায় উত্তরপ্রদেশের আম আদমি পার্টি (আপ) তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দলটির উত্তরপ্রদেশ বুদ্ধিস্ট প্রদেশের সভাপতি ইমরান লতিফ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
আপের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে কখন নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।
দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই পদক্ষেপ ‘বাবাসাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকরের সংবিধানে আঘাত’। তাদের দাবি, ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করেছে।
আপের বক্তব্য, বিষয়টি শুধু একটি ধর্মীয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নয়; বরং এটি আইনের শাসন ও সংবিধান রক্ষার প্রশ্ন।
‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্বেষের এজেন্ডা’
কংগ্রেস নেতা জাভেদ আশরাফ খান এ ঘটনাকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্বেষের এজেন্ডা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিজেপি ও আরএসএসের কাছে ‘ধ্বংস করা ছাড়া আর কোনো সমাধান আছে কি না’।
একই সঙ্গে তিনি এ ঘটনায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী আবদুর রকীব খানও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য, ‘আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।’
মাদরাসা ভাঙার আগে সব সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
তার মতে, প্রশাসনের এমন পদক্ষেপের কারণে শিশুদের শিক্ষা, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের আস্থার ক্ষতি হওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে রাস্তা বা সরকারি জমি দখল করে থাকা সব সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রে সমান, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠা, ১৯৬৭ সালে বর্তমান স্থানে স্থানান্তর
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থনগর জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ডোমরিয়াগঞ্জ তহসিলে অবস্থিত মাদরাসাটি প্রথমে ১৯৩৮ সালে গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৬৭ সালে এটি পিপরা রামলালের প্রধান সড়কের বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়।
দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি ওই এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখে আসছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাদরাসাটিতে প্রায় ৪০০ শিশু পড়াশোনা করছিল। উচ্ছেদ অভিযানে মাদরাসার একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ায় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান, সরকারি জমিতে কথিত অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতেই আদালতের নির্দেশ অনুসারে অভিযান চালানো হয়েছে। ফলে ঘটনাটি একদিকে সরকারি জমি উদ্ধারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ, অন্যদিকে সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অভিযানের অভিযোগ—দুই দিক থেকেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: মক্তব মিডিয়া

