ডিসি পদের দাম ৭০ কোটি! ১৮ মাসে ১৪০ কোটি ফেরতের চাঞ্চল্যকর চুক্তি ফাঁস

১৮ মাসে ১৪০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার; ১৬.৫০ কোটি টাকার চেক উদ্ধার, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তদন্ত শুরু

by ABDUR RAHMAN
ডিসি পদের দাম ৭০ কোটি

অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

বাংলাদেশের মাঠ প্রশাসনে সবচেয়ে প্রভাবশালী পদগুলোর একটি—চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি)। এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পেতে ৭০ কোটি টাকার গোপন চুক্তি করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টার তথ্য সামনে এসেছে। শুধু চুক্তিই নয়, পদটি নিশ্চিত করতে দেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকার জামানত চেক এবং দায়িত্ব পাওয়ার পর ১৮ মাসের মধ্যে ‘কাজের মাধ্যমে’ মূল টাকার দ্বিগুণ অর্থাৎ ১৪০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি।

বিজ্ঞাপন
banner

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা ও তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. সালাহউদ্দিন আহমেদকে কেন্দ্র করে এসব আর্থিক লেনদেন ও লিখিত চুক্তির নথি আবর্তিত হচ্ছে।

নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, ঘটনার সূচনা গত বছরের ২৪ নভেম্বর। শত টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ধানমন্ডির বাসিন্দা আহমেদ শাকিল খানের সঙ্গে ৪ কোটি টাকার একটি ঋণ চুক্তি করেন উপসচিব সালাহউদ্দিন। সেখানে শর্ত ছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপূর্বে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার। জামানত হিসেবে সালাহউদ্দিনের সিটি ব্যাংকের হিসাব থেকে ৪ কোটি টাকার দুটি চেক প্রদান করা হয়।

এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘পরিচালক’ হিসেবে বদলি করে। তবে শূন্য পদ না থাকায় পরবর্তীতে তাকে ‘কন্ট্রোলার অব স্টোরস’ পদে পদায়ন করা হয়।

পছন্দসই পদ না পাওয়ায় হতাশ হয়ে সালাহউদ্দিনের পাঠানো একটি কথিত বার্তা থেকে জানা যায়, তিনি ‘নিঃস্ব’ হয়ে পড়েছেন এবং এর পেছনে তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক ব্যক্তির ভূমিকা ছিল।

বন্দর কর্তৃপূর্বে পদায়নের পরও থামেনি শীর্ষ পদে যাওয়ার চেষ্টা। গত ১৬ জুলাইয়ের এক চাঞ্চল্যকর নথিতে স্বাক্ষর রেখে সালাহউদ্দিনকে চট্টগ্রামের ডিসি পদে নিয়োগ পাওয়ার বিনিময়ে ৭০ কোটি টাকার চুক্তি করতে দেখা যায়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর ১৮ মাসের মধ্যে ‘বিশেষ উপায়ে বা কাজের মাধ্যমে’ ১৪০ কোটি টাকা ফেরত দিতে হবে। তবে সরকারি পদে থেকে আইনিভাবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে সংস্থান করা হবে বা টাকা কার কাছে পৌঁছাবে—তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নথিতে পাওয়া যায়নি।

তদবিরের মধ্যস্থতাকারীদের আশ্বস্ত করতে সালাহউদ্দিন তার বোনের জাতীয় পরিচয়পত্র, সোনালী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মোট ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার ১২টি স্বাক্ষর করা চেক এবং নিজ সার্ভিস প্রোফাইলের কপি জমা দেন। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের বগুড়া শাখার ৫টি চেকে সাড়ে ১১ কোটি এবং সিটি ব্যাংকের ৭টি চেকে ৫ কোটি টাকা উল্লেখ ছিল।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে উপসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তার ফোন হ্যাক হয়েছিল, চেক হারিয়েছিল এবং জাতীয় পরিচয়পত্র চুরি হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো আইনি ব্যবস্থা বা জিডি না করার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া আমার ভুল হয়েছে।”

পরবর্তীতে সচিবালয়ের অভ্যন্তরীণ চিত্র তুলে ধরে সালাহউদ্দিন মন্তব্য করেন, “সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের কাছে নানা প্রস্তাব নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন গোষ্ঠী আসা- যাওয়া করে। এসব ঘটনা অহরহ ঘটছে এবং এখনো ঘটছে। অস্বীকার করে লাভ নেই।”

এদিকে ডিসি পদের মতো সংবেদনশীল আসনে নিয়োগ ঘিরে এমন বিশাল অঙ্কের লেনদেন ও দরকষাকষির নথি প্রকাশ্যে আসায় নড়েচড়ে বসেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর আইন ও বিধি মোতাবেক কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গত বছরের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সরকার পরিবর্তনের পর থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ডিসি পদায়ন ও বদলি নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এর আগে মাঠ প্রশাসনে ডিসি নিয়োগের ফিট লিস্ট তৈরি, ভাইভা ও পদায়ন ঘিরে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের একাধিক অভিযোগ ও সচিবালয়ে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন জেলার ডিসি পদায়ন বাতিল ও পুনঃপর্যালোচনা করে। আমলাতন্ত্রের উচ্চপর্যায়ে সিন্ডিকেট ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পদ বাগিয়ে নেওয়ার যে রেওয়াজ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে, সালাহউদ্দিনের নথি প্রকাশের ঘটনাটি তার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে দেখছেন প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা।

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ