আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
ভারতের উত্তর প্রদেশে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাড়িতে আটকে রাখার ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত দুই বোনকে অবিলম্বে মুক্ত করার পাশাপাশি তাদের অধিকার লঙ্ঘনের জন্য মোট ২৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চ একটি হেবিয়াস কর্পাস আবেদনের শুনানি শেষে এ নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের অর্ধেক অর্থ দুই নারীর বাবা এবং বাকি অর্ধেক উত্তর প্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ৩৫ বছর বয়সী অংশু ভাটিয়া, যিনি বর্তমানে আমিনা অংশু ভাটিয়া নামে পরিচিত, ২০২০ সালে নিজের ইচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার ২০ বছর বয়সী বোন দিয়া ভাটিয়াও ২০২১ সালে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বর্তমানে জোয়া দিয়া ভাটিয়া নামে পরিচিত।
তবে দুই মেয়ের ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত মেনে নেননি তাদের বাবা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাড়িতে আটকে রাখেন। বিষয়টি আদালতে গড়ালে দুই বোন নিজেদের বক্তব্যে জানান, কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ, প্রলোভন বা প্রতারণার কারণে তারা ইসলাম গ্রহণ করেননি। নিজেদের মানসিক শান্তি, বিবেক ও ধর্মীয় বিশ্বাস থেকেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে আদালতকে জানান তারা।
দুই বোনের বক্তব্য শোনার পর আদালত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ধর্মীয় পছন্দের অধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের চিন্তা, ধর্ম, বসবাস ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রাখেন। পরিবারের সদস্যদের আপত্তি কিংবা সামাজিক মতাদর্শের কারণে সেই স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
শুনানিতে উত্তর প্রদেশ সরকার ও দুই নারীর বাবার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের ধর্মান্তরের পেছনে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে এবং এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত। এ প্রেক্ষাপটে উত্তর প্রদেশের বেআইনি ধর্মান্তরবিরোধী আইন এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় এফআইআর দায়েরের বিষয়টি আদালতে তুলে ধরা হয়।
তবে আদালত ধর্মান্তরের আইনগত বৈধতা যাচাইয়ের বিষয়টির সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক দুই নারীকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখার বিষয়টিকে আলাদা করে দেখেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ধর্মান্তর নিয়ে তদন্ত বা আইনি প্রশ্ন থাকলেও তা কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে আটকে রাখার বৈধ কারণ হতে পারে না।
জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তার পক্ষে পুলিশ যথেষ্ট শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি বলেও আদালত উল্লেখ করেন। আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, অপরাধের তদন্তের অজুহাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেআইনি বন্দিদশাকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে তা ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশে দুই বোনকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে না রাখার পাশাপাশি তাদের স্বাধীনভাবে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তারা কোথায় এবং কার সঙ্গে বসবাস করবেন, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও তাদের থাকবে। তাদের চলাফেরা বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা যাবে না। প্রয়োজন হলে উত্তর প্রদেশ সরকারকে তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করতে হবে।
এ ছাড়া দুই নারীর পাসপোর্ট, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, পরিচয়পত্র, ব্যাংক পাসবুকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত নথিপত্র তাদের বাবাকে সাত দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
ক্ষতিপূরণের অর্থ আট সপ্তাহের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মোট ২৫ লাখ রুপির অর্ধেক অর্থাৎ ১২ লাখ ৫০ হাজার রুপি দুই নারীর বাবা এবং সমপরিমাণ অর্থ উত্তর প্রদেশ সরকারকে দিতে হবে।
রায়ে আদালত মূলত এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর অভিভাবকত্বের অজুহাতে তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সীমিত করার অধিকার বাবা-মায়ের নেই। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ধর্মীয় পছন্দ বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত পরিবারের সদস্য কিংবা রাষ্ট্রের পছন্দের সঙ্গে না মিললেও তাকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখার বৈধতা তৈরি হয় না।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সাংবিধানিক ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: মিল্লাত টাইমস উর্দু

