মিয়ানমারে ফের আলোচনায় মিতসোন বাঁধ, ভূমিকম্পের শঙ্কার মধ্যেই নির্মাণের উদ্যোগ

চীন সফরের পর প্রকল্প পুনরুজ্জীবিতের উদ্যোগ; ব্যয় বেড়ে হতে পারে প্রায় ১১.৫ বিলিয়ন ডলার, পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ

by ABDUR RAHMAN
মিয়ানমারে ফের আলোচনায় মিতসোন বাঁধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ

দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের কাচিন রাজ্যের বিতর্কিত মিতসোন বাঁধ প্রকল্প আবারও আলোচনায় এসেছে। সামরিক জান্তা সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় আট বছরের মধ্যে ৩৬০ কোটি ডলারের এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চায় সরকার। তবে বর্তমান ব্যয় বেড়ে প্রায় ১১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
banner

সম্প্রতি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকারী জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের চীন সফরের পর প্রকল্পটি পুনরায় চালুর বিষয়টি সামনে আসে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, সফরের সময় চীনের সঙ্গে এ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার বলছে, বিদ্যুৎ সংকটে থাকা দেশটির জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ১০ গিগাওয়াট বিদ্যুতের অর্ধেকেরও বেশি এই প্রকল্প থেকে উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

মিতসোন বাঁধ প্রকল্পটি মালি ও নমাই নদীর মিলনস্থলে ১৫২ মিটার উচ্চতার একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে শুরু হয়েছিল। ২০০৯ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হলেও স্থানীয় জনগণের তীব্র বিরোধিতা, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কার কারণে ২০১১ সালে তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি স্থগিত করে। সে সময় অভিযোগ ওঠে, প্রকল্প থেকে উৎপাদিত প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ চীনে রপ্তানি করা হবে, যা মিয়ানমারের জাতীয় স্বার্থের চেয়ে চীনের স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।

কাচিন রাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য হতেত পাইং হতু রয়টার্সকে জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই প্রকল্পটির নির্মাণকাজ আবার শুরু হতে পারে। একই সঙ্গে কাচিন রাজ্যের আইনপ্রণেতাসহ একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মিন অং হ্লাইংয়ের সরকার প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বিভিন্ন বৈঠকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রকল্পটিকে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সরকারের দাবি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশগত ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র খাইং খাইং সো বলেছেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বন্যা, পরিবেশ ও বাস্তুচ্যুতি নিয়ে উদ্বেগ সরকার বিবেচনায় রাখছে। তবে এ আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন অনেক পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইরেনা) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, চীন ও ভারত ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য দেশের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রতি কিলোওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরিতে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৯১৪ ডলার ব্যয় হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালে নির্ধারিত ৩৬০ কোটি ডলারের প্রকল্পটির বর্তমান ব্যয় তিন গুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ১১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

এদিকে চলতি বছরের মার্চ মাসে মধ্য মিয়ানমারে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির পর বড় বাঁধ নির্মাণের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এ ধরনের বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এরই মধ্যে ৪৯টি নাগরিক সমাজের সংগঠন প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি স্থানীয় জনগণের জীবন, জীবিকা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চলমান সংঘাতের মধ্যেও প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মিয়ানমারে বিদ্যুৎ ঘাটতি দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। সরকার এই প্রকল্পকে জ্বালানি সংকট সমাধানের অন্যতম উপায় হিসেবে তুলে ধরলেও পরিবেশগত নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগণের অধিকার এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

আর/

banner

এ জাতীয় আরো সংবাদ