অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান সুদভিত্তিক অর্থনীতি বাতিল করে দেশে যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালুর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যাকাতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক সংকট অনেকাংশে দূর করা সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি আলেমদের সমন্বয়ে একটি যাকাত কমিটি বা সরকারের অধীনে পৃথক ‘যাকাত মন্ত্রণালয়’ গঠনের প্রস্তাব দেন।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ‘যাকাত’ শব্দটির কোনো উল্লেখ নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাঁর মতে, নামাজ প্রতিষ্ঠা ও যাকাত ব্যবস্থা কার্যকর হলে মানুষের চরিত্র গঠনের পাশাপাশি ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। তিনি দাবি করেন, সঠিকভাবে যাকাত আদায় করা গেলে বছরে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহ করা সম্ভব, যা দিয়ে বাজেটের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। তবে যাকাতের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য আলেমদের নেতৃত্বে একটি কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
সুদভিত্তিক অর্থনীতির কঠোর সমালোচনা করে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ইসলামে সুদকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য বলা হয়েছে। তাই আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করতে না চাইলে সুদভিত্তিক অর্থনীতি বন্ধ করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং বাংলাদেশেও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সম্ভাবনা ছিল। তাঁর অভিযোগ, দেশে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংককে প্রায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। যদিও বিভিন্ন ব্যাংকে ইসলামিক কাউন্টার চালুর মাধ্যমে সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সুদের অর্থ মানুষের জীবন ও সমাজে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে এবং সুদনির্ভর অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতারও সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষ্য, ঋণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর। ব্যক্তি বা রাষ্ট্র—কোনো ক্ষেত্রেই ঋণকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। ঋণ পরিশোধ না করে মৃত্যুবরণ করা ইসলামী দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর বিষয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগেরও বিরোধিতা করেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থকে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া অন্যায়কে উৎসাহিত করে। তাঁর মতে, ঘুষ বা অবৈধ আয়ের অর্থ কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না। একই সঙ্গে দেশে মদ, বিড়ি ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। তবে মদ ও বিড়ির দাম বাড়ানোর উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বক্তব্যে কওমি মাদ্রাসার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে কোরআন-হাদিস শিক্ষা দেওয়া হয়। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো মাদ্রাসার ছোট ছোট শিক্ষার্থীদেরও পোশাক ও জুতার সুবিধা দেওয়া উচিত। পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষকদের মর্যাদার প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি, সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে শর্তসাপেক্ষে এমপিওভুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণেরও দাবি জানান।
শ্রমিকদের অধিকার নিয়েও তিনি বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি পরিশোধের ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়ন করা উচিত। বেকারত্ব দূর করতে জনগণের হাতে কর্মসংস্থান তুলে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, মানুষকে শুধু কার্ড দিয়ে নয়, কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেই স্বাবলম্বী করতে হবে। পাশাপাশি দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণেরও প্রস্তাব দেন তিনি।
মসজিদে রাজনীতি নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যারা মসজিদে রাজনীতি করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন, তাদের মনে রাখা উচিত যে মদিনা রাষ্ট্রের কেন্দ্র ছিল মসজিদে নববী। সেখান থেকেই কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার শিক্ষা এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, বিজয়ের পর আল্লাহর প্রশংসা ও নিজের গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু সংসদে অনেকেই আল্লাহর প্রশংসা না করে সরাসরি নেতানেত্রীর প্রশংসা করেছেন, যা তাঁর মতে আল্লাহর নির্দেশনার পরিপন্থী। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা হলে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ অর্জন সম্ভব।
এ সময় তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকার হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সংকটের বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন এবং সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পাশাপাশি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, শ্রমিকের অধিকার, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
আর/

