অনলাইন ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বালিকা মাদরাসায় হামলা ও ভাঙচুরের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) সকালে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় এলাকার সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
নিখোঁজ ছাত্রীর পরিবারের সঙ্গে আসা বহিরাগতদের বিরুদ্ধে মাদরাসার আবাসিক ভবনের ফটক ভাঙার চেষ্টা এবং কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে মারধরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে অনাবাসিক ছাত্রীদের ছুটির সময়ে মারিয়া আক্তার লিমা (১২) নামের এক আবাসিক ছাত্রী নিরাপত্তাকর্মীর নজর এড়িয়ে মাদরাসা থেকে বের হয়ে যায়।
ঘটনাটি নিশ্চিত হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে তার অভিভাবকদের বিষয়টি অবহিত করা হয়। পরিবারের সদস্যরা মাদরাসায় এসে সিসিটিভি ফুটেজও পর্যবেক্ষণ করেন।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ছাত্রীর সন্ধান না মেলায়, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ওই দিন সন্ধ্যার পর সাভার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নম্বর ১১৫৬) করা হয়।
পুলিশি তদন্তে ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তা এবং সহপাঠীদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে মারিয়া স্বেচ্ছায় মাদরাসা থেকে বের হয়েছে।
সহপাঠীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আল আমিন নামের এক যুবকের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই যুবকের মাধ্যমেই সে মাদরাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।
তবে পুলিশি তদন্ত চলার মাঝেই গত ১৫ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে নিখোঁজ ছাত্রীর পরিবারের সদস্যরা কয়েকজন সাংবাদিক ও ইউটিউবারকে সঙ্গে নিয়ে অতর্কিত মাদরাসায় উপস্থিত হন।
সে সময় তাঁদের সঙ্গে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন বহিরাগত লোকও ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই বহিরাগতরা মাদরাসার আবাসিক ভবনের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালান।
এ সময় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত বেশ কয়েকজন পুরুষ শিক্ষক তাঁদের বাধা দিতে গেলে তাঁদের ওপর চড়াও হয়ে মারধর করা হয়।
সে সময় মাদরাসার আবাসিক ভবনে সাড়ে চার শতাধিক ছাত্রী অবস্থান করছিল। এই অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুরের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে ছাত্রীরা কান্নাকাটি ও চিৎকার শুরু করে।
এদিকে, খবর পেয়ে পার্শ্ববর্তী আরেকটি মাদরাসার কিছু শিক্ষার্থী সহযোগিতার জন্য এগিয়ে এলে হামলাকারীদের মারধরের শিকার হন তাঁরাও। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
এই পরিস্থিতির একপর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও আশপাশের মাদরাসার অন্যান্য শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ বাঁধে।
সরু রাস্তায় এই সংঘর্ষের মাঝে পড়ে কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন এবং তাঁদের গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের অনুরোধ ও মধ্যস্থতায় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করে।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদরাসা ও আশপাশের সড়কের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলে বহিরাগতদের দলবদ্ধভাবে প্রবেশ এবং আবাসিক ভবনের ফটক ভাঙচুরের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
সাড়ে চার শতাধিক ছাত্রীর সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষার্থে এবং হামলাকারীদের প্রতিহত করতেই গেট বন্ধের এই চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
উত্তেজনাকর এই পরিস্থিতির পর স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের উপস্থিতিতে সাভার থানায় দুই পক্ষের একটি যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
উক্ত বৈঠকে নিখোঁজ ছাত্রীর সন্ধান বের করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পাশাপাশি, এ কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করতে উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সবুজ গণমাধ্যমকে জানান, নিখোঁজ ছাত্রীকে উদ্ধারে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে এবং দ্রুতই ইতিবাচক সংবাদ পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে, পুরো ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে একটি কুচক্রী মহল মাদরাসা ও আলেম সমাজের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে কর্তৃপক্ষ।
মাদরাসার অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা আলী আকবর কাসেমী বৃহত্তর ঢাকা জেলা উত্তর হেফাজতে ইসলামের সভাপতি হওয়ায় পুরো বিষয়ের নেপথ্যে কোনো রাজনৈতিক বা গভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
এই আকস্মিক হামলা ও অস্থিতিশীলতায় মাদরাসার ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও স্থানীয় এলাকাবাসী।
তাঁরা মাদরাসা এবং আবাসিক শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।

