আন্তর্জাতিক ডেস্ক | হুদহুদ নিউজ
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক কল্যাণব্যবস্থার অবনতির প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দেশজুড়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে এবং সারা দেশ থেকে অন্তত ১৬০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মার্সেইয়ে বিক্ষোভকারীরা সড়ক থেকে নিরাপত্তা বেষ্টনী সরিয়ে সিটি হলের মূল দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। অল্প সময়ের জন্য পৌর ভবনের ভেতরে অবস্থান নিয়ে এক বিক্ষোভকারী দেয়ালে নৈরাজ্যের প্রতীক ‘এ’ স্প্রে করে লেখেন। ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহাসিক ‘বাস্টিল দুর্গ দখল’-এর স্লোগান দিয়ে এ সময় তাদের অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পাশাপাশি, প্যারিসের পশ্চিমাঞ্চলে ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম ‘সি-নিউজ’ ও ‘ইউরোপ ১’-এর কার্যালয় লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হলে বেশ কয়েকটি জানালার কাঁচ ভেঙে যায়। প্যারিসের প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ছোড়া হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার দুপুর পর্যন্ত প্যারিসের বাইরে দেশব্যাপী প্রায় ১৪০টি পৃথক কর্মসূচিতে প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ মানুষ অংশ নেন। আট বছর আগে জ্বালানি কর বাড়ানোর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে এবার ‘হলুদ ও তরুণদের’ যৌথ ব্যানারে এই বিক্ষোভ ডাকা হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, পেনশনভোগী এবং কৃষকদের এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান আয়োজকেরা। গত মাসে প্যারিসের দরিদ্র উপশহরগুলোর স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা এখন বহুমুখী রূপ নিয়ে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, ফ্রান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশ নাগরিক বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ২০২৪ সাল থেকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে শুরু করার পাশাপাশি চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন-ইরান যুদ্ধ শুরুর জেরে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে ইউরো অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতির দেশটিতে সরকারি ঋণ জিডিপির ১২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ। এই বিপুল ঋণ সামলাতে এবং পেনশন ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সামাজিক সুবিধা কাটছাঁট করার সরকারি উদ্যোগের কারণে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে চলমান এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের অতি-বাম ও অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার চেষ্টা করছে। উগ্র বামপন্থী ‘ফ্রান্স আনবাউড’ দলের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে, জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা উগ্র ডানপন্থী নেত্রী মারিন ল্য পেন পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নাগরিকদের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় প্যারিসের শঁজেলিজে অ্যাভিনিউসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
সূত্র: এএফপি ও দ্য গার্ডিয়ান

